**১
±সবুজ পত্রের±
*বলাকা, ২ / সর্ব্বনেশে
এবার যে ঐ এল সর্ব্বনেশে গো!
বেদনায় যে বান ডেকেছে
রোদনে যায় ভেসে গো!
রক্তমেঘে ঝিলিক মারে,
বজ্র বাজে গহন-পারে,
কোন্ পাগল ঐ বারে বারে
উঠ্চে অট্টহেসে গো!
এ<+++>{বা}র যে ঐ এল সর্ব্বনেশে গো!
জীবন এবার মাতল মরণ-বিহারে!
এইবেলা নে বরণ করে
সব দিয়ে তোর ইহারে!
চাহিস্নে আর আগুপিছু,
রাখিস্নে তুই লুকিয়ে কিছু,
চরণে কর্ মাথা নী<+++>{চু}
সিক্ত আকুল কেশে গো!
এবার যে ঐ এল সর্ব্বনেশে গো!
পথটাকে আজ <ঘর> আপন করে নিয়োরে!
গৃহ আঁধার হল, প্রদীপ
নিবল শয়ন-শিয়রে।
ঝড় এসে তোর ঘর ভরেছে,
এবার যে তোর ভিত নড়েছে,
শুনিস্ নি কি ডাক পড়েছে
নিরুদ্দেশের দেশে গো!
এবার যে ঐ এল সর্ব্বনেশে গো!
±(পরপৃষ্ঠায়)±
**২
ছিছিরে ঐ চোখের জল আর ফেলিস্নে!
ঢাকিস্ নে মুখ ভয়ে ভয়ে
কোণে আঁচল মেলিস্নে!
কিসের তরে চিত্ত বিকল,
ভাঙুক্ না তোর দ্বারের শিকল,
বাহির পানে ছোট্ না, সকল
দুঃখ সুখের শেষে গো!
এবার যে ঐ এল সর্ব্বনেশে গো!
কণ্ঠে কি তোর জয়ধ্বনি ফুট্বে না?
চরণে তোর রুদ্র তালে
নূপুর বেজে উঠ্বে না?
এই লীলা তোর কপালে যে
লেখা ছিল,— সকল ত্যেজে
<এ+++ রক্ত বেশে +++>
রক্তবাসে আয়রে সেজে
আয়না বধূর বেশে গো!
ঐ বুঝি তোর এল সর্ব্বনেশে গো!
**৩
±ওঁ
আর একটি কবিতা— আষাঢ়ে চলিতে পারিবে। অথবা এইটে জ্যৈষ্ঠে দিয়া অন্যটা আষাঢ়ে চলিবে।±
*বলাকা
*৩
আমরা চলি সমুখ পানে,
কে আমাদের বাঁধবে?
রৈল যারা পিছুর টানে
কাঁদবে তারা কাঁদবে।
ছিঁড়ব বাধা রক্ত পায়ে,
চলব ছুটে রৌদ্রে ছায়ে,
জড়িয়ে ওরা আপন গায়ে
কেবলি ফাঁদ ফাঁদবে।
কাঁদবে ওরা কাঁদবে।
রুদ্র মোদের হাঁক দিয়েছে
বাজিয়ে আপন তূর্য্য।
মাথার পরে ডাক দিয়েছে
মধ্যদিনের সূর্য্য।
**৪
মন ছড়াল আকাশ ব্যেপে,
আলোর নেশায় গেছি ক্ষেপে,
ওরা আছে দুয়ার ঝেঁপে,
চক্ষু ওদের ধাঁধবে।
কাঁদবে <+++> ওরা কাঁদবে।
সাগর গিরি করবরে জয়
যাব তাদের লঙ্ঘি’।
একলা পথে করিনে ভয়,
সঙ্গে ফেরেন সঙ্গী।
আপন ঘোরে আপ্নি মেতে
আছে ওরা <+++>{গ}ণ্ডি পেতে,
ঘর ছেড়ে আঙিনায় যেতে
বাধবে ওদের বাধবে।
কাঁদবে ওরা কাঁদবে।
জাগবে ঈশান, বাজ্বে বিষাণ
পুড়বে সকল বন্ধ।
উড়বে হাওয়ায় বিজয় নিশান
ঘুচবে দ্বিধাদ্বন্দ্ব।
**৫
মৃত্যুসাগর মথন করে
অমৃতরস আনব হরে’,
ওরা জীবন আঁকড়ে ধরে
মরণ-সাধন সাধবে।
কাঁদবে ওরা কাঁদবে।
**৬
*বলাকা, ৫ / পাড়ি
মত্ত সাগর দিল পাড়ি গহন রাত্রিকালে
ঐ যে আমার নেয়ে।
ঝড় বয়েছে, ঝড়ের হাওয়া লাগিয়ে দিয়ে পালে
আস্চে তরী বেয়ে।
কালো রাতের কালী-ঢালা ভয়ের বিষম বিষে
আকাশ যেন মূর্চ্ছি পড়ে সাগর সাথে মিশে,
উতল ঢেউয়ের দল ক্ষেপেছে, না পায় তারা দিশে,
উধাও চলে ধেয়ে।
হেনকালে এ দুর্দ্দিনে ভাবল মনে কি সে
কূল-ছাড়া মোর নেয়ে<!>{?}
এমন রাতে উদাস হয়ে কেমন অভিসারে
আসে আমার নেয়ে?
শাদা পালের চমক দিয়ে নিবিড় অন্ধকারে
আস্চে তরী বেয়ে।
কোন্ ঘাটে যে ঠেক্বে এসে কে জানে তার পাতী,
পথহারা কোন্ পথ দিয়ে সে আস্বে রাতারাতী,
কোন্ অচেনা আঙিনাতে তারি পূজার বাতি
রয়েছে পথ চেয়ে?
অগৌরবার বাড়িয়ে গরব করবে আপন সাথী
বিরহী মোর নেয়ে।
এই তুফানে এই তিমিরে খোঁজে কেমন খোঁজা
বিবাগী মোর নেয়ে?
নাহি জানি পূর্ণ করে’ কোন্ রতনের বোঝা
আস্চে তরী বেয়ে?
নহে নহে, নাইক মানিক, নাই রতনের ভার,
একটি ফুলের গুচ্ছ আছে রজনীগন্ধার,
**৭
সেইটি হাতে আঁধার রাতে সাগর হবে পার
আনমনে গান গেয়ে।
কার গলাতে নবীন প্রাতে পরিয়ে দেবে হার
<চির>নবীন আমার নেয়ে?
সে থাকে এক পথের পাশে, অদিনে যার তরে
বাহির হল নেয়ে।
তারি লাগি পাড়ি দিয়ে সবার অগোচরে
আস্চে তরী বেয়ে।
রুক্ষ অলক উড়ে পড়ে, সিক্ত-<+++>{প}লক আঁখি,
ভাঙা ভিতের ফাঁক দিয়ে তার বাতাস চলে হাঁকি,
দীপের আলো বাদল-বায়ে কাঁপচে থাকি থাকি
ছায়াতে ঘর ছেয়ে।
তোমরা যাহার নাম জান না তাহারি নাম ডাকি
ঐযে আসে নেয়ে।
অনেক দেরী হয়ে গেছে বাহির হল কবে
উন্মনা মোর নেয়ে।
এখনো রাত হয় নি প্রভাত, অনেক দেরী হবে
আস্তে তরী বেয়ে।
বাজ্বেনাকো তুরীভেরী, জান্বেনাকো কেহ,
কেবল যাবে আঁধার কেটে, আলোয় ভরবে গেহ,
দৈন্য যে তার ধন্য হবে, পুণ্য হবে <গেহ,> দেহ
পুলক পরশ পেয়ে।
নীরবে তার চিরদিনের ঘুচিবে সন্দেহ
কূলে আস্বে নেয়ে।।
**৮
*বলাকা, ৬ / ছবি
তুমি কি কেবল ছবি, শুধু পটে লিখা?
— ওই যে সুদূর নীহারিকা
যারা করে আছে ভীড়
আকাশের নীড়;
ওই যারা দিনরাত্রি
আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী
গ্রহ তারা রবি
তুমি কি তাদেরি মত সত্য নও?
হায় ছবি, তুমি শুধু ছবি?
চিরচঞ্চলের মাঝে তুমি কেন শান্ত হয়ে রও?
পথিকের সঙ্গ লও
ওগো <প+++হীন> পথহীন!
কেন রাত্রিদিন
সকলের মাঝে থেকে সবা হতে আছ এত দূরে
স্থিরতার চির অন্তঃপুরে?
এই ধূলি
ধূসর অঞ্চল তুলি
বায়ুভরে ধায় দিকে দিকে;
বৈশাখে সে বিধবার আভরণ খুলি
তপস্বিনী ধরণীরে সাজায় গৈরিকে;
অঙ্গে তার পত্রলিখা দেয় লিখে
বসন্তের মিলন-ঊষায়—
এই ধূলি এও সত্য হায়;—
এই তৃণ
বিশ্বের চরণতলে লীন
এরা যে <{+++}> অস্থির, তাই এরা সত্য সবি,—
তুমি স্থির, তুমি ছবি,
তুমি শুধু ছবি!
একদিন এইপথে চলেছিলে আমাদের পাশে।
<+++>{বক্ষ} তব দুলিত নিশ্বাসে;
অঙ্গে অঙ্গে প্রাণ তব
কত গানে কত নাচে
রচিয়াছে
আপনার ছন্দ নব নব
বিশ্বতালে রেখে তাল;
সে যে আজ হল কতকাল!
এ জীবনে
আমার ভুবনে
কত সত্য ছিলে!
মোর চক্ষে এ নিখিলে
দিকে দিকে তুমিই লিখিলে
রূপের তুলিকা ধরি রসের মূরতি।
সে প্রভাতে তুমিই ত ছিলে
এ-বিশ্বের বাণী মূর্ত্তিমতী।
একসাথে পথে যেতে যেতে
রজনীর আড়ালেতে
তুমি গেলে থামি।
তার পরে আমি
কত দুঃখে সুখে
রাত্রিদিন চলেছি সম্মুখে।
চলেছে জোয়ার ভাঁটা আলোকে আঁধারে
**৯
আকাশ-পাথারে;
পথের দু’ধারে
চলেছে ফুলের দল নীরব চরণে
বরণে বরণে;
সহস্রধারায় ছোটে দুরন্ত জীবন-নির্ঝরিণী
মরণের বাজায়ে কিঙ্কিণী।
অজানার সুরে
চলিয়াছি দূর হতে দূরে,
মেতেছি পথের প্রেমে।
তুমি পথ হতে নেমে
যেখানে দাঁড়ালে
সেখানেই আছ থেমে।
এই তৃণ, এই ধূলি— ওই তারা, ওই শশিরবি
সবার আড়ালে
তুমি ছবি, তুমি শুধু ছবি!
কি প্রলাপ কহে <+++>{ক}বি?
তুমি ছবি?
নহে, নহে, নও শুধু ছবি!
কে বলে রয়েছ স্থির রেখার বন্ধনে
নিস্তব্ধ ক্রন্দনে?
মরি মরি সে আনন্দ থেমে যেত যদি
এই নদী
হারাত তরঙ্গবেগ;
এই মেঘ
মুছিয়া ফেলিত তার সোনার লিখন।
তোমার চিকন
চিকুরের ছায়াখানি বিশ্ব হতে যদি মিলাইত
তবে
একদিন কবে
চঞ্চল পবনে লীলায়িত
মর্ম্মর-মুখর ছায়া মাধবীবনের
হত স্বপনের।
তোমায় কি গিয়েছিনু ভুলে?
তুমি যে নিয়েছ বাসা জীবনের মূলে
তাই ভুল।
অন্য <+++>{মনে} চলি পথে, ভুলিনে কি ফুল?
ভুলিনে কি তারা?
তবুও তাহারা
প্রাণের নিশ্বাসবায়ু করে সুমধুর,
ভুলের শূন্যতামাঝে ভরি দেয় সুর।
ভুলে থাকা নয় সে ত ভোলা;
বিস্মৃতির মর্ম্মে বসি <র<+++>{ক্তে}> {রক্তে} মোর দিয়েছ যে দোলা।
নয়নসম্মুখে তুমি নাই,
নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই;
আ<+++>{জি} তাই
শ্যামলে শ্যামল তুমি, নীলিমায় নীল।
আমার নিখিল
তোমাতে পেয়েছে তার অন্তরের মিল।
<কেহ> নাহি জানি, কেহ নাহি জানে
তব সুর বাজে মোর গানে;
কবির অন্তরে তুমি কবি
নও ছবি, নও ছবি, নও শুধু ছবি!
{তোমারে} পেয়েছি<+++> কোন্ প্রাতে,
তার পরে হারায়েছি রাতে।
তার <+++>{প}রে অন্ধকারে অগোচরে তোমারেই লভি।
নও ছবি, নও তুমি ছবি।
**১০
*বলাকা, ৭ / তাজমহল
একথা জানিতে তুমি, ভারতঈশ্বর সা-জাহান,
কালস্রোতে ভেসে যায় জীবনযৌবন ধনমান<,>{।}
শুধু তব অন্তর বেদনা
চিরন্তন হয়ে থাক্ সম্রাটের ছিল এ সাধনা।
রাজশক্তি বজ্র-সুকঠিন
সন্ধ্যারক্তরাগসম তন্দ্রাতলে হয় হোক্ লীন
<এ> কেবল একটি দীর্ঘশ্বাস
নিত্য-উচ্ছ্বসিত হয়ে সকরুণ করুক্ আকাশ
এই তব মনে ছিল আশ।
হীরামুক্তামাণিক্যের ঘটা
যেন শূন্য দিগন্তের ইন্দ্রজাল ইন্দ্রধনুচ্ছটা
<লু+++> যায় যদি লুপ্ত হয়ে যাক্,
শুধু থাক্
একবিন্দু নয়নের জল
কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল
এ তাজমহল।
হায় ওরে মানব-হৃদয়
বারবার
কারো পানে ফিরে চাহিবার
নাই যে সময়,
নাই নাই!
জীবনের খরস্রোতে ভাসিছ সদাই
ভুবনের ঘাটে ঘাটে<।>{;—}
«এক» হাটে লও বোঝা, শূন্য করে দাও অন্যহাটে।
দক্ষিণের মন্ত্র-গুঞ্জরণে
তব কুঞ্জবনে
বসন্তের মাধবী-মঞ্জরী
যেই ক্ষণে দেয় ভরি
মালঞ্চের চঞ্চল অঞ্চল,
বিদায়-গোধূলি আসে ধুলায় ছড়ায়ে ছিন্নদল।
সময় যে নাই;
আবার শিশিররাত্রে তাই
নিকুঞ্জে ফুটায়ে তোলো নব কুন্দরাজি
সাজাইতে হেমন্তের অশ্রুভরা আনন্দের সাজি।
হায়রে হৃদয়
তোমার সঞ্চয়
দিনান্তে নিশান্তে শুধু পথপ্রান্তে ফেলে যেতে হয়।
নাই নাই, নাই যে সময়!
হে সম্রাট, তাই তব শঙ্কিত হৃদয়
চেয়েছিল করিবারে সময়ের হৃদয় হরণ
সৌন্দর্য্যে ভুলায়ে।
কণ্ঠে তার কি মালা দুলায়ে
করিলে বরণ
রূপহীন মরণেরে মৃত্যুহীন অপরূপ সাজে<!>{?}
রহে না যে
বিলাপের অবকাশ
বারো মাস,
তাই তব অশান্ত ক্রন্দনে
চির মৌন <+++লে> {জাল} দিয়ে বেঁধে দিলে কঠিন বন্ধনে।
<জ্যোৎস্নারাতে>
**১১
জ্যোৎস্নারাতে নিভৃত মন্দিরে
প্রেয়সীরে
যে নামে ডাকিতে ধীরে ধীরে
সেই কানে-কানে ডাকা রেখে গেলে এইখানে
অনন্তের কানে।
প্রেমের করুণ কোমলতা
ফুটিল তা
সৌন্দর্য্যের পুষ্পপুঞ্জে প্রশান্ত পাষাণে।
হে সম্রাট কবি,
এই তব হৃদয়ের ছবি,
এই তব নব মেঘদূত,
অপূর্ব্ব অদ্ভুত
ছন্দে গানে
উঠিয়াছে অলক্ষ্যের পানে
যেথা তব বিরহিণী প্রিয়া
রয়েছে মিশিয়া
প্রভাতের অরুণ-আভাসে,
ক্লান্ত-সন্ধ্যা দিগন্তের করুণ নিশ্বাসে,
{পূর্ণিমায়} দেহহীন চামেলির লাবণ্য-বিলাসে,
ভাষার অতীত তীরে
কাঙাল নয়ন যেথা দ্বার হতে আসে ফিরে ফিরে।
তোমার সৌন্দর্য্য দূত যুগযুগ ধরি
এড়াইয়া কালের প্রহরী
চলিয়াছে বাক্যহারা এই বার্ত্তা নিয়া
“ভুলি নাই, ভুলি নাই, ভুলি নাই প্রিয়া।”
চলে গেছ তুমি আজ,
মহারাজ;
রাজ্য তব স্বপ্নসম গেছে <টুটে> ছুটে,
সিংহাসন গেছে টুটে;
তব সৈন্যদল
যাদের চরণভরে ধরণী করিত টলমল
তাহাদের স্মৃতি আজ বায়ুভরে
উড়ে যায় দিল্লীর পথের ধূলিপরে।
বন্দীরা গাহেনা গান;
যমুনা-কল্লোলসাথে নহবৎ মিলায় না তান;
তব পুরসুন্দরীর নূপুর-নিক্কণ
ভগ্ন প্রাসাদের কোণে
মরে’ গিয়ে ঝিল্লিস্বনে
কাঁদায়রে নিশার গগন।
তবুও তোমার দূত অমলিন,
শ্রান্তিক্লান্তিহীন,
তুচ্ছ করি রাজ্য ভাঙা-গড়া,
তুচ্ছ করি জীবনমৃত্যুর ওঠা-পড়া,
যুগে যুগান্তরে
কহিতেছে একস্বরে
চিরবিরহীর বাণী নিয়া
“ভুলি নাই, ভুলি নাই, ভুলি নাই প্রিয়া।”
মিথ্যা কথা,— কে বলে যে ভোল নাই?
কে বলেরে খোলো নাই
স্মৃতির পিঞ্জরদ্বার?
অতীতের চির অস্ত-অন্ধকার
**১২
আজিও হৃদয় তব রেখেছে বাঁধিয়া?
বিস্মৃতির মুক্তিপথ দিয়া
আজিও সে হয়নি বাহির?
সমাধিমন্দির
একঠাঁই রহে চিরস্থির;
ধরার ধূলায় থাকি
স্মরণের আবরণে মরণেরে যত্নে রাখে ঢাকি।
জীবনেরে কে রাখিতে পারে?
আকাশের প্রতি তারা ডাকিছে তাহারে।
তার নিমন্ত্রণ লোকে লোকে
নব নব পূর্ব্বাচলে আলোকে আলোকে।
স্মরণের গ্রন্থি টুটে
সে যে যায় ছুটে
বিশ্বপথে বন্ধনবিহীন।
মহারাজ, কোনো মহারাজ্য কোনোদিন
পারে নাই তোমারে ধরিতে;
<সু> সমুদ্রস্তনিত পৃথ্বী, হে বিরাট, তোমারে ভরিতে
নাহি পারে,—
তাই এ ধরারে
জীবন উৎসব শেষে দুই পায়ে ঠেলে
মৃৎপাত্রের মত যাও ফেলে।
তোমার কীর্ত্তির চেয়ে তুমি যে মহৎ,
তাই তব জীবনের রথ
পশ্চাতে ফেলিয়া যায় কীর্তিরে তোমার
বারম্বার।
তাই
চিহ্ণ তব পড়ে আছে, তুমি হেথা নাই।
যে প্রেম সম্মুখপানে
চলিতে চালাতে নাহি জানে,
যে প্রেম পথের মধ্যে পেতেছিল নিজ সিংহাসন,
তার বিলাসের সম্ভাষণ
পথের ধূলার মত জড়ায়ে ধরেছে তব পায়ে,
দিয়েছ তা’ ধূলিরে ফিরায়ে।
সেই তব পশ্চাতের পথধূলিপরে
তব চিত্ত হতে বায়ুভরে
কখন্ সহসা
উড়ে পড়েছিল বীজ জীবনের মাল্য হতে খসা<,>{।}
তুমি চলে গেছ দূরে
সেই বীজ অমর অঙ্কুরে
উঠেছে অম্বরপানে,
কহিছে গম্ভীর গানে—
“যতদূর চাই
নাই নাই সে পথিক নাই!
প্রিয়া তারে রাখিলনা, রাজ্য তারে ছে<+++>{ড়ে} দিল পথ,
রুধিলনা সমুদ্রপর্ব্বত।
আজি তার রথ
চলিয়াছে রাত্রির আহ্বানে
নক্ষত্রের গানে
প্রভাতের সিংহদ্বারপানে।
তাই
স্মৃতিভারে আমি পড়ে আছি
ভারমুক্ত সে এখানে নাই।
এলাহাবাদ
১৫ই কার্ত্তিক ১৩২১
**১৩
*বলাকা, ৯ / তাজমহল
কে তোমারে দিল প্রাণ
রে পাষাণ?
কে তোমারে জোগাইছে এ অমৃতরস
বরষ বরষ?
তাই দেবলোকপানে নিত্য তুমি রাখিয়াছ ধরি
ধরণীর আনন্দমঞ্জরী;
তাই তো তোমারে ঘিরি বহে বারোমাস
অবসন্ন বসন্তের বিদায়ের বিষণ্ণ নিশ্বাস;
মিলনরজনীপ্রান্তে ক্লান্ত চোখে
ম্লান দীপালোকে
ফুরায়ে গিয়েছে যত অশ্রু-গলা গান
তোমার অন্তরে তারা আজিও জাগিছে অফুরান<।>{,}
হে পাষাণ, অমর পাষাণ!
বিদীর্ণ হৃদয় হতে বাহিরে আনিল বহি
সে রাজ-বিরহী
বিরহের রত্নখানি;
দিল আনি
বিশ্বলোক হাতে
সবার সাক্ষাতে।
নাই সেথা সম্রাটের প্রহরী সৈনিক,
ঘিরিয়া ধরেছে তারে দশদিক্;
আকাশ তাহার পরে
যত্নভরে
রেখে দেয় নীরব চুম্বন
চিরন্তন;
প্রথম মিলনপ্রভা
রক্তশোভা
দেয় তারে প্রভাত অরুণ,
বিরহের ম্লানহাসে
পাণ্ডুভাসে
জ্যোৎস্না তারে করিছে করুণ।
সম্রাটমহিষী,
তোমার প্রেমের স্মৃতি সৌন্দর্য্যে হয়েছে মহীয়সী।
সে স্মৃতি তোমারে ছেড়ে
গেছে বেড়ে
সর্ব্বলোকে
জীবনের অক্ষয় আলোকে।
অঙ্গ ধরি সে অনঙ্গ-স্মৃতি
বিশ্বের প্রীতির মাঝে মিলাইছে সম্রাটের প্রীতি।
রাজ-অন্তঃপুর হতে আনিল বাহিরে
গৌরবমুকুট তব,— পরাইল সকলের শিরে
যেথা যার রয়েছে প্রেয়সী;—
রাজার প্রাসাদ হতে দীনের কুটীরে
তোমার প্রেমের স্মৃতি সবারে করিল মহীয়সী।
সম্রাটের মন,
সম্রাটের ধনজন
এই রাজকীর্ত্তি হতে করিয়াছে বিদায় গ্রহণ।
আজ সর্ব্বমানবের অনন্ত বেদনা
এ পাষাণ সুন্দরীরে
আলিঙ্গনে ঘিরে
রাত্রিদিন করিছে সাধনা।
শ্রীরবীন্দ্রনাথঠাকুর
এলাহাবাদ
৫ পৌষ ১৩২১
**১৪
*বলাকা, ১৫ / [\আমার গান\]
মোর গান এরা সব শৈবালের দল,
যেথায় জন্মেছে সেথা আপনারে করে নি অচল।
মূল নাই, ফুল আছে, শুধু পাতা আছে,
আলোর আনন্দ নিয়ে জলের তরঙ্গে এরা নাচে।
বাসা নাই নাইক সঞ্চয়,
অজানা অতিথি এরা কবে আ<+++>{সে} নাইক নিশ্চয়।
যেদিন শ্রাবণ নামে দুর্নিবার মেঘে,
দুই কূল ডোবে স্রোতোবেগে,
আমার শৈবালদল
উদ্দাম চঞ্চল,
বন্যার ধারায়
পথ যে হারায়,
দেশে দেশে
দিকে দিকে যায় ভেসে ভেসে।
*বলাকা, ২৯ / [\তুমি-আমি\]
যেদিন তুমি আপ্নি ছিলে একা
আপ্নাকে ত হয় নি তোমার দেখা।
সেদিন কোথাও কারো লাগি ছিলনা পথ-চাওয়া,
এপার হতে ও পার চেয়ে
বয় নি ধেয়ে
কাঁদন-ভরা বাঁধন-ছেঁড়া হাওয়া।
আমি এলেম, ভাঙল তোমার ঘুম,
শূন্যে শূন্যে ফুটল আলোর আনন্দকুসুম।
আমায় তুমি ফুলে ফুলে
ফুটিয়ে তুলে
দুলিয়ে দিলে নানারূপের দোলে।
আমায় তুমি তারায় তারায় ছড়িয়ে দিয়ে কুড়িয়ে নিলে কোলে।
আমায় তুমি মরণমাঝে লুকিয়ে ফেলে
ফিরে ফিরে নূতন করে পেলে।
আমি এলেম, কাঁপ্ল তোমার বুক,
আমি এলেম, এল তোমার দুখ,
আমি এলেম, এল তোমার আগুনভরা আনন্দ,
জীবনমরণ তুফান-তোলা ব্যাকুল বসন্ত।
আমি এলেম, তাইত তুমি এলে,
আমার মুখে চেয়ে
আমার পরশ পেয়ে
আপন পরশ পেলে।
আমার চোখে লজ্জা আছে, আমার বুকে ভয়,
আমার মুখে ঘোম্টা পড়ে রয়<।>{;—}
দেখতে তোমায় বা<+++>{ধে} বলে’ পড়ে চোখের জল।
ওগো আমার প্রভু,
জানি আমি তবু
আমায় দেখ্বে বলে’ তোমার অসীম কৌতূহল,
নইলে ত এই সূর্য্যতারা সকলি নিষ্ফল।।
শ্রীরবীন্দ্রনাথঠাকুর
**১৫
*বলাকা, ৩১ / [\পূর্ণের অভাব\]
নিত্য তোমার পায়ের কাছে
তোমার বিশ্ব তোমার আছে,
কোনোখানে অভাব কিছু নাই।
পূর্ণ তুমি, তাই
তোমার ধনে মানে তোমার «আ»নন্দ না ঠেকে।
তাই ত একে একে
যা-কিছু ধন তোমার আছে আমার করে লবে।
এম্নি করেই হবে
এ ঐশ্বর্য্য তব
তোমার আপন কাছে, প্রভু, নিত্য নব<+++>{ন}ব।
এম্নি করেই দিনে দিনে
আমার চো«খে» লও যে কিনে
তোমার সূর্য্যোদয়।
এম্নি করেই দিনে দিনে
আপন প্রেমের পরশমণি আপ্নি যে লও চিনে
আমার পরাণ করি হিরণ্ময়।
«শ্রীরবীন্দ্রনাথঠাকুর»
**১৬
*বলাকা, ১০ / উপহার
হে প্রিয়, আজি এ «প্রা»তে
নিজ হাতে
কী তোমারে দিব দান?
প্রভাতের গান?
প্রভাত যে ক্লান্ত হয় তপ্তরবিকরে
আপনার বৃন্তটির পরে;
অবসন্ন গান
হয় অবসান।
হে বন্ধু, কি চাও তুমি দিবসের শেষে
মোর দ্বারে এসে?
কি তোমারে দিব আনি?
সন্ধ্যাদীপখানি?
এ দীপের আলো এ যে নিরালা কোণের,
স্তব্ধ ভবনের।
তোমার চলার পথে এরে নিতে চাও জনতায়?
এ যে হায়
পথের বাতাসে নিবে যায়।
কি মোর শকতি আছে তোমারে যে দিব উপহার?
হোক্ ফুল, হোক্ না গলার হার
তার ভার
কেনই বা সবে<;>{,}
একদিন যবে
নিশ্চিত শুকাবে তারা ম্লান ছিন্ন হবে!
<নিজ হ’তে তব হাতে যাহা দিব>
নিজ হ’তে তব হাতে যাহা দিব তুলি
তারে তব শিথিল অঙ্গুলি
যাবে ভুলি,—
ধূলিতে খসিয়া শেষে হয়ে যাবে ধূলি।
তার চেয়ে যবে
ক্ষণকাল অবকাশ হবে,
বসন্তে আমার পুষ্পবনে
চলিতে চলিতে অন্যমনে
অজানা গোপনগন্ধে পুলকে চমকি
দাঁড়াবে থমকি,
পথহারা সেই উপহার
হবে সে তোমার।
যেতে যেতে বীথিকায় মোর
চোখেতে লাগিবে ঘোর,
দেখিবে সহসা—
সন্ধ্যার কবরী হতে খসা
একটি রঙীন আলো কাঁপি থরথরে
ছোঁয়ায় পরশমণি স্বপনের পরে,
সেই আলো, অজানা সে উপহার
সেইত তোমার।
আমার যা শ্রেষ্ঠধন সে ত শুধু চমকে ঝলকে,
দেখা দেয় মিলায় পলকে।
বলে না আপন নাম, পথেরে শিহরি দিয়া সুরে
চলে যায় চকিতে নূপুরে।
**১৭
সেথা পথ নাহি জানি,
সেথা নাহি যায় হাত, নাহি যায় বাণী।
বন্ধু, তুমি সেথা হতে আপনি যা পাবে
আপনার ভাবে,
না চাহিতে না জানিতে সেই উপহার
সেইত তোমার।
আমি যাহা দিতে পারি সামান্য সে দান—
হোক্ ফুল, হোক্ তাহা গান।
শান্তিনিকেতন
১০ই পৌষ ১৩২১
*বলাকা, ১১ / বিচার
হে মোর সুন্দর,
যেতে যেতে
পথের প্রমোদে মেতে
যখন <+++> তোমার গায়
কারা সবে ধূলা দিয়ে যায়,
আমার অন্তর
করে হায় হায়!
কেঁদে বলি, হে মোর সুন্দর,
আজ তুমি হও দণ্ডধর,
করহ বিচার!—
তারপরে দেখি,
এ কি,
খোলা তব বিচারঘরের দ্বার,—
নিত্য চলে তোমার বিচার।
নীরবে প্রভাত আলো পড়ে
তাদের কলুষরক্ত নয়নের পরে;
শুভ্র বনমল্লিকার বাস
স্পর্শ করে লালসার উদ্দীপ্ত নিশ্বাস;
সন্ধ্যাতাপসীর হাতে জ্বালা
সপ্তর্ষির পূজাদীপমালা
তাদের মত্ততাপানে সারারাত্রি চায়—
হে সুন্দর, তব গায়
ধূলা দিয়ে যারা চলে যায়!
হে সুন্দর,
তোমার বিচারঘর
পুষ্পবনে,
পুণ্য সমীরণে,
তৃণপুঞ্জে পতঙ্গগুঞ্জনে,
বসন্তের বিহঙ্গ-কূজনে,
তরঙ্গ চুম্বিত তীরে মর্ম্মরিত পল্লব-বীজনে।
প্রেমিক আমার,
তারা যে নির্দ্দয় ঘোর, তাদের যে আবেগ দুর্ব্বার।
লুকায়ে ফেরে যে তারা করিতে হরণ
তব আভরণ,
সাজাবারে
আপনার নগ্ন বাসনারে।
তাদের আঘাত যবে প্রেমের সর্ব্বাঙ্গে বাজে,
সহিতে সে পারি না যে;
**১৮
অশ্রুআঁখি
তোমারে কাঁদিয়া ডাকি,—
খড়গ ধর, প্রেমিক আমার,
করগো বিচার!
তার পরে দেখি
এ কি,
কোথা তব বিচার-আগার?
জননীর স্নেহ-অশ্রু ঝরে
তাদের উগ্রতা পরে;
প্রণয়ীর অসীম বিশ্বাস
তাদের বিদ্রোহশেল ক্ষতবক্ষে করি লয় গ্রাস।
প্রেমিক আমার,
তোমার সে বিচার আগার
বিনিদ্র স্নেহের {স্তব্ধ} নিঃশব্দ বেদনামাঝে,
সতীর পবিত্র লাজে,
সখার হৃদয়রক্তপাতে,
পথ-চাওয়া প্রণয়ের বিচ্ছেদের রাতে,
অশ্রুপ্লুত করুণার পরিপূর্ণ ক্ষমার প্রভাতে।
হে রুদ্র আমার,
লুব্ধ তা’রা, মুগ্ধ তা’রা, হয়ে পার
তব সিংহদ্বার,
সঙ্গোপনে
বিনা নিমন্ত্রণে
সিঁধ কেটে চুরি করে তোমার ভাণ্ডার।
চোরা ধন <+++ {+++}> {দুর্ব্বহ} সে ভার
পলে পলে
তাহাদের মর্ম্ম দলে,
সাধ্য নাহি রহে নামাবার।
তোমারে কাঁদিয়া তবে কহি বারম্বার,—
এদের মার্জ্জনা কর, হে রুদ্র আমার!
চেয়ে দেখি মার্জ্জনা যে নামে এসে
প্রচণ্ড ঝঞ্ঝার বেশে;
সেই ঝড়ে
ধূলায় তাহারা পড়ে;
চুরির প্রকাণ্ড বোঝা খণ্ডখণ্ড হয়ে
সে বাতাসে কোথা যায় বয়ে?
হে রুদ্র আমার,
মার্জ্জনা তোমার
গর্জ্জমান বজ্রাগ্নিশিখায়,
সূর্য্যাস্তের প্রলয় লিখায়,
<উল্কা+++> রক্তের বর্ষণে,
অকস্মাৎ সংঘাতের ঘর্ষণে ঘর্ষণে।
শান্তিনিকেতন
১২ পৌষ ১৩২১
**১৯
*বলাকা
*৪১
যে কথা বলিতে চাই,
বলা হয় নাই,—
সে কেবল এই—
চিরদিবসের বিশ্ব আঁখিসম্মুখেই
দেখিনু সহস্রবার
দুয়ারে আমার।
অপরিচিতের এই চিরপরিচয়
এতই সহজে নিত্য ভরিয়াছে গভীর হৃদয়
সে কথা বলিতে পারি এমন সরল বাণী
আমি নাহি জানি।
শূন্য প্রান্তরের গান বাজে ওই একা ছায়াবটে;
নদীর এ পারে «ঢা»লু তটে
চাষী করিতেছে চাষ;
উড়ে চলিয়াছে হাঁস
ওপারের জনশূন্য তৃণশূন্য বালু«তী»রতলে।
চলে কি না চলে
ক্লান্তস্রোত শীর্ণ নদী, নিমেষ-নিহত
আধ-জাগা নয়নের মত।
পথখানি বাঁকা
বহুশত বরষের পদচিহ্ণ আঁকা
চলেছে মাঠের ধারে— ফসল ক্ষেতের যেন মিতা—
নদীসাথে কুটীরের বহে কুটুম্বিতা।
ফাল্গুনের এ আলোয় এই গ্রাম ওই শূন্যমা«ঠ»,
ওই খেয়া ঘাট
ওই নীল নদীরেখা, ওই দূর বালুকার কোলে
নিভৃত জলের ধারে চখাচখি কাকলী-কল্লোলে
যেখানে বসায় মেলা— এই সব ছবি
কতদিন দেখিয়াছে কবি।
শুধু এই চেয়ে দেখা, এই পথ বেয়ে চলে যাওয়া,
এই আলো, এই হাওয়া,
**২০
এইমত অস্ফুটধ্বনির গুঞ্জরণ,
ভেসে-যাওয়া মেঘ হতে
অকস্মাৎ নদীস্রোতে
ছায়ার নিঃশব্দ সঞ্চরণ,
যে আনন্দ বেদনায় এ জীবন বারেবারে করেছে উদাস
হৃদয় খুঁজিছে আজি তাহারি প্রকাশ।
পদ্মা
৮ই ফাল্গুন ১৩২২
**২১
*বলাকা
*১২
তুমি দেবে, তুমি মোরে দেবে,
গেল দিন এই কথা নিত্য ভেবে ভেবে।
সুখে দুঃখে উঠে নেবে
বাড়ায়েছি হাত
দিনরাত;
কেবল ভেবেছি, দেবে, দেবে,
আরো কিছু দেবে।
দিলে, তুমি দিলে, শুধু দিলে;
কভু পলে পলে তিলে তিলে,
কভু অকস্মাৎ বিপুল প্লাবনে
দানের শ্রাবণে।
নিয়েছি, ফেলেছি কত, দিয়েছি ছড়ায়ে,
হাতে পায়ে রেখেছি জড়ায়ে
জালের মতন;
দানের রতন
লাগায়েছি ধূলার খেলায়
অযত্নে হেলায়,
আলস্যের ভরে
ফেলে গেছি ভাঙা খেলাঘরে।
তবু তুমি দিলে, শুধু দিলে, শুধু দিলে,
তোমার দানের পাত্র নিত্য ভরে’ উঠিছে নিখিলে।
অজস্র তোমার
সে নিত্য দানের ভার
আজি আর
পারিনা বহিতে।
পারিনা সহিতে
এ ভিক্ষুক হৃদয়ের অক্ষয় প্রত্যাশা,
দ্বারে তব নিত্য যাওয়া-আসা।
যত পাই তত পেয়ে পেয়ে
তত চেয়ে চেয়ে
পাওয়া মোর চাওয়া মোর {শুধু} বেড়ে যায়;
অনন্ত সে দায়
সহিতে না পারি হায়
জীবনে প্রভাত সন্ধ্যা ভরিতে ভিক্ষায়।
লবে তুমি, মোরে তুমি লবে, তুমি লবে,
এ<+++> প্রার্থনা পূরাইবে কবে?
শূন্য পিপাসায় গড়া এ পেয়ালাখানি
ধূলায় ফেলিয়া টানি,—
সারারাত্রি পথ-চাওয়া কম্পিত আলোর
<অন্ধকার> {প্রতীক্ষার} দীপ মোর
নিমেষে নিবায়ে
নিশীথের বায়ে,
আমার কণ্ঠের মালা তোমার গলায় পরে’
ল’বে মোরে ল’বে মোরে
তোমার দানের স্তূপ হ’তে
তব রিক্ত আকাশের অন্তহীন নির্ম্মল আলোতে।
শান্তিনিকেতন
১৩ পৌষ
**২২
*বলাকা, ৩৭ / ঝড়ের খেয়া
±প্রুফ পাঠালে ভাল হয় শ্রীকবি±
দূর হতে কি শুনিস্ মৃত্যুর গর্জ্জন, ওরে দীন,
ওরে উদাসীন,
ওই ক্রন্দনের কলরোল,
লক্ষ <+++> বক্ষ হতে মুক্ত<+++> রক্তের কল্লোল<+++>{!}
<+++> বহ্ণিবন্যা-তরঙ্গের বেগ,
<+++> বিষশ্বা<+++>{স} <+++> {ঝটিকার} মেঘ,
ভূতল গগন
<বিহ্বল করিয়া দিল> {মূর্চ্ছিত বিহ্বল-করা} মরণে মরণে আলিঙ্গন;—
ওরি মা<ঝখানে>{ঝে} পথ চিরে চিরে
নূতন সমুদ্রতী<র +++>{রে}
তরী নিয়ে দিতে হবে পাড়ি,—
ডাকিছে কাণ্ডারী।
এসেছে আদেশ—
বন্দরে বন্ধনকাল এবারের মত হল শেষ,
পুরানো সঞ্চয় নিয়ে ফিরে ফিরে শুধু বেচাকেনা
আর চলিবেনা।
বঞ্চনা বাড়িয়া <উঠে> {ওঠে} ফুরায় সত্যের যত পুঁজি,—
কাণ্ডারী ডাকিছে তাই বুঝি,—
“তুফানের মাঝখানে
নূতন সমুদ্রতীর পানে
<+++>{দি}তে হবে পাড়ি।”
তাড়াতাড়ি
তাই ঘর ছাড়ি
চারিদিক হতে ওই দাঁড় হাতে ছুটে আসে দাঁড়ি!
“নূতন <+++> ঊষার স্বর্ণদ্বার
খুলিতে বিলম্ব কত আর?”
এ কথা শুধায় সবে
ভীত আর্ত্তরবে
ঘুম হতে অকস্মাৎ জেগে।
ঝড়ের পুঞ্জিত মেঘে
কালোয় ঢেকেছে আলো,— জানে না ত কেউ
রাত্রি আছে কি না আছে; দিগন্তে ফেনায়ে উঠে ঢেউ,—
তারি মাঝে ফুকারে কাণ্ডারী,—
“নূতন সমুদ্রতীরে তরী নিয়ে দিতে হবে পাড়ি।”
বাহিরিয়া এল কারা? মা কাঁদিছে পিছে,
প্রেয়সী দাঁড়ায়ে দ্বারে নয়ন মুচিছে।
ঝড়ের গর্জ্জন মাঝে
বিচ্ছেদের হাহাকার বাজে;
ঘরে ঘরে শূন্য হল আরামের শয্যাতল;
“যাত্রা কর, যাত্রা কর যাত্রি দল”,
উঠেছে আদেশ,
“বন্দরের কাল হল শেষ!”
মৃত্যুভেদ করি
দুলিয়া চলেছে তরী।
কোথায় পৌঁছিবে ঘাটে, কবে হবে পার,
সময় ত নাই শুধাবার।
{এই শুধু জানিয়াছে সার}
তরঙ্গের সাথে লড়ি’
বাহিয়া চলিতে হবে তরী।
টানিয়া রাখিতে হবে পাল,
আঁকড়ি ধরিতে হবে হাল;—
বাঁচি আর মরি
বাহিয়া চলিতে হবে তরী।
এসেছে আদেশ—
বন্দরের কাল হল শেষ।
অজানা সমুদ্রতীর, অজানা সে দেশ,—
সেথাকার লাগি
উঠিয়াছে জাগি
ঝটিকার কণ্ঠে কণ্ঠে শূন্যে শূন্যে প্রচণ্ড আহ্বান।
**২৩
মরণের গান
উঠেছে ধ্বনিয়া পথে নবজীবনের অভিসারে
ঘোর অন্ধকারে।
যত দুঃখ পৃথিবীর, যত পাপ, যত অমঙ্গল,
যত অশ্রুজল,
যত হিংসা হলাহল,
সমস্ত উঠিছে তরঙ্গিয়া,
কূল উল্লঙ্ঘিয়া,
ঊর্দ্ধ আকাশেরে ব্যঙ্গ করি।
তবু বেয়ে তরী
সব ঠেলে হতে হবে পার,
কানে নিয়ে নিখিলের হাহাকার,
শিরে নিয়ে উন্মত্ত দুর্দ্দিন,
চিত্তে নিয়ে আশা অন্তহীন,
হে নির্ভীক, দুঃখ-অভিহত।
ওরে ভাই, কার নিন্দা কর তুমি?— মাথা কর নত!
এ আমার এ তোমার পাপ।
বিধাতার বক্ষে এই তাপ
বহু যুগ হতে জমি বায়ুকোণে আজিকে ঘনায়,—
ভীরুর ভীরুতাপুঞ্জ, প্রবলের উদ্ধত অন্যায়,
লোভীর নিষ্ঠুর লোভ
বঞ্চিতের নিত্য চিত্তক্ষোভ,
জাতি অভিমান,
মানবের অধিষ্ঠাত্রী দেবতার বহু অসম্মান,
বিধাতার বক্ষ আজি বিদীরিয়া
ঝটিকার দীর্ঘশ্বাসে জলে স্থলে বেড়ায় <+++>{ফি}রিয়া।
ভাঙিয়া পড়ুক ঝড়, জাগুক তুফান,
নিঃশেষ হইয়া যাক নিখিলের যত বজ্রবাণ!
রাখ নিন্দাবাণী, রাখ আপন সাধুত্ব-অভিমান,
শুধু একমনে হও পার
এ প্রলয় পারাবার
নূতন সৃষ্টির উপকূলে
নূতন বিজয়ধ্বজা তুলে!
দুঃখেরে দেখেছি নিত্য, পাপেরে দেখেছি নানা ছলে;
অশান্তির ঘূর্ণি দেখি জীবনের স্রোতে পলে পলে;
মৃত্যু করে লুকাচুরি
সমস্ত পৃথিবী জুড়ি।
ভেসে যায় তারা সরে’ যায়
জীবনেরে করে’ যায়
ক্ষণিক বিদ্রূপ।
আজ দেখ তাহাদের অভ্রভেদী বিরাট স্বরূপ!
তার পরে দাঁড়াও সম্মুখে,
বল অকম্পিত বুকে,—
“তোরে নাহি করি ভয়,
এ সংসারে প্রতিদিন তোরে করিয়াছি জয়<,>{।}
তোর চেয়ে আমি সত্য এ বিশ্বাসে প্রাণ দিব, দেখ্<,>{!}
শান্তি সত্য, শিব সত্য, সত্য সেই চিরন্তন এক!”
<শ্রীরবীন্দ্রনাথঠাকুর
কলিকাতা
২৩ কার্ত্তিক ১৩২২>
মৃত্যুর অন্তরে পশি অমৃত না পাই যদি খুঁজে,
সত্য যদি নাহি মেলে দুঃখ সাথে যুঝে,
পাপ যদি নাহি মরে’ যায়
আপনার প্রকাশ-লজ্জায়,
অহঙ্কার ভেঙে নাহি পড়ে আপনার অসহ্য সজ্জায়,
তবে ঘর-ছাড়া সবে
অন্তরের কি আশ্বাসরবে
মরিতে ছুটিছে শত শত
প্রভাত আলোর পানে লক্ষ লক্ষ নক্ষত্রের মত?
±(পরপৃষ্ঠায়)±
**২৪
বীরের এ রক্তস্রোত, মাতার এ অশ্রুধারা
এর যত মূল্য সে কি ধরার ধূলায় হবে হারা?
স্বর্গ কি হবে না কেনা?
বিশ্বের ভাণ্ডারী শুধিবেনা
এত ঋণ?
রাত্রির তপস্যা সে কি আনিবেনা দিন?
<নিদারুন দুঃখরাতে
মৃত্যুঘাতে
মানুষ {+++} +++ আপনার সীমা
তখন দিবে না দেখা দেবের {+++ অমর} মহিমা?>
{নিদারুণ দুঃখরাতে
মৃত্যুঘাতে
মানুষ চূর্ণিল যবে নিজ মর্ত্ত্যসীমা
তখন দিবেনা দেখা দেবতার অমর মহিমা?}
শ্রীরবীন্দ্রনাথঠাকুর
কলিকাতা
২৩শে কার্তিক ১৩২২
±<এই কবিতাটি সবুজপত্রের শেষ অংশে যাইবে।>±
*সবুজ পত্রের জন্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অনুকৃত কালিদাস রায়ের কবিতা
<আমার “তুমি”
যে চোখে তোমারে, প্রিয়ে, দেখে বিশ্বজন
সে চোখে তোমারে যদি আমি হেরিতাম
তা হলে তোমার পায়ে জীবন যৌবন
<সকলি কি নির্ব্বিচারে দিতে পারিতাম<!>{?}
তুমি যে আমার চোখে কি মহা রতন
দর্পণে হেরিয়া সঙ্গ নারিবে বুঝিতে।
“দিতে যদি পারিতাম আমার নয়ন
আমার “তোমাতে” কবে হ’ত না খুঁজিতে।
আমার অন্তর-চক্ষু, দৈহিক নয়নে>
লুপ্ত করিয়াছে, রাত্রি চন্দ্রেরে যেমন।
অন্তর হেরিছে তার অন্তরের ধনে,
এ যেন ঋষির মহামন্ত্রের দর্শন।
আমার “তুমিটি” সে যে সবার “তোমাকে”
চিরদিন ঘুরি ঘুরি অন্তরালে ঢাকে।
শ্রী কালিদাস রায়>
